শনিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

তুষার কবির (পাণ্ডুলিপি)


তুষার কবির বিরচিত "রক্তকোরকের ওম"-পাণ্ডুলিপিটি বই আকারে প্রকাশিত হবে ২০১৪ ইং বর্ষের অমর একুশে গ্রন্থমেলায়। বইটির প্রকাশনায়ঃ শুদ্ধস্বর। বইটির সম্বন্ধে জানাতেই প্রকাশিতব্য পাণ্ডুলিপির মধ্যথেকে বেশ কয়েকটি কবিতা নিয়ে কার্তুজের এবারের রাউন্ড "পাণ্ডুলিপি সমাচার ২০১৪"

- রক্তকোরকের ওম -



ভ্রমর ও ভায়োলিন

শীতের প্রচ্ছদ খুলে উড়ে আসে কবেকার ঘুমঘোর চিঠি। আর কুয়াশার সরোবর থেকে বেজে ওঠে শরীরের হাড়হিম স্বর। শীতের কোরকে দ্যাখো একে একে ধরা দিচ্ছে হাওয়ায় হারিয়ে যাওয়া ভায়োলিন, পাতাঝরা আমলকীবন আর প্রান্তরের কুমারী ভ্রমর!

অরণ্যের নিঝুম পিয়ন খালি পায়ে দ্যাখো দৌড়ে যাচ্ছে কবির ডেরায়। প্রহরী মেঘের লগবুক হাতে ছুটে যাচ্ছে এক পুরনো কয়েদী। এ শীতের ধূলিপত্রে বিশদ মুদ্রিত হবে জংশনের জলছাপ, রূপশালি চিত্রনাট্য আর ধানকাটা আল ধরে কিশোরীর ছেঁড়া ছেঁড়া ছাপচিত্র!

তোমার বুকের মাঝে বেজে যাচ্ছে একটা বিভ্রমের ভায়োলিন, পাঁজরের গহিন গভীরে বেজে যাচ্ছে, এ শীতের আততায়ী কান্না নিয়ে, অলিন্দ কোটরে তা বেজে যাচ্ছে, আধোনীল হ্যারিকেন জ্বলা ঘনশীত রাতে, চিলেকোঠা থেকে আস্তে আস্তে তা ভেসে আসছে, তারপর মিশে যাচ্ছে বাগদেবীর পাতায় মোড়ানো কোনো হরিৎ আশ্রমে!


ছাপ

কুহকিনী প্রেমের ফসিল;
তোর ফেলে দেয়া ভাঁজপত্র আমি তুলে রেখেছি
জলপাইরঙের কাঠবাক্সে—
গোপন তোরঙ্গে যা যা ছিল সেগুলোও
আস্তে আস্তে উঠিয়ে রেখেছি;
ধাতুহীন চাবির ছড়াটা, পশমের মাফলার,
ময়ূর পালক, ভেজা কোয়েলের ডিম,
সুগন্ধি রুমাল, ঘোড়ার জিনের বেল্ট,
সবকিছু সরিয়ে রেখেছি একে একে
ছাঁচলণ্ঠনের ঈষৎ আভায়—

শহরের ঝানু বেহালাবাদকের কাছ থেকে
আরও জেনে নিয়েছি
যাবার সময় তুই যা যা বলে গিয়েছিস—
সমুদ্রবিভ্রম থেকে পেয়ে গেছি
তাঁবুছেঁড়া মোমের মাস্তুল,
ক্যাথেড্রালের ঝাড়বাতি,
জলজোছনায় ডাহুকীর ডাক—
তোর ছেড়ে যাওয়া ঝিনুক কোটর
খুঁজে পেয়েছি তক্ষকের তমসাআশ্রমে—
তোর রেখে যাওয়া দীর্ঘশ্বাসগুলো
জমিয়ে রেখেছি বিকেলের কুহককার্নিশে—
তোর ফেলে যাওয়া সুগন্ধি রুমাল
লুকিয়ে রেখেছি বনরুইয়ের গড়ানো গ্রীবায়—

আর তোকে বলতেই ভুলে গেছি
হারানো আত্মার সারাৎসার খুঁজে দেখি
শুধু তোর চুম্বনের একটা কীটদষ্ট ছাপ রয়ে গেছে!


সরোবর

রক্তকোরকের নিচে ওটা জেগে আছে; শীতের হাওয়া
তার রঙিন প্রচ্ছদ খুলে বের হয়ে যাওয়ার আগে
প্রান্তরের মুদ্রিত কুয়াশা দ্যাখো
তোমাকে জানিয়ে গেছে অসমাপ্ত শীতবার্তা!

আর শীতের ধোঁয়াটে ভোরে অই ঘুমঘোর সরোবর থেকে
একে একে ভেসে ওঠে কিশোরীর শীতচিঠি,
পিয়ানোর রিড, লকলকে হেমলক,
বকের পালক আর শালিকের সিলিকন ডানা।

কুয়াশার ক্যারাভানে তুমি নগ্ন শুয়ে আছ
শীতলাগা বেড়ালের মতো; আর আমি চক্মকি পাথরের খোঁজে
পুরনো প্রান্তর ছেড়ে এই শীতে
হেঁটে যাই প্রতœশহরের আরো কিছু দূরে—

দেখি শ্বেতধোঁয়া সরোবরে ভেসে উঠছে
কবিতার বুদ্বুদ; যার ধোঁয়াশা গোলকে দেখা যাচ্ছে
লাল কার্ডিগান পরা তুমি শুয়ে আছ
পাতাঝরা হরিৎ ডেরায়— দুরারোগ্য শীতঘুমে!


উপাখ্যান

ওর ডেরা থেকে বের হয়ে
প্রান্তরের শেষ রেখা ধরে
আমি কিছুটা হেঁটে গেলাম;
শূন্যতার পর আরো খানিক শূন্যতা মিশে গেছে
হাওয়াঘেরা মেঘরাশির মাঝে—

দেখি কতিপয় জংলি মানুষের পদচ্ছাপ;
জেব্রার গ্রীবার হাড়,
টোটেম গুহার গায়ে ছাপচিত্র,
সূর্যাস্তের উল্কি আঁকা তরুণীর উরু,
বাঁশের খোড়লে মদ,
বর্শা হাতে মেতে থাকা অগ্নিনৃত্যের উৎসন্ন উৎসব,
চেরাই কাঠের দাবানলে
তিতিরের পোড়া মাংস ঝল্সে খেতে খেতে
ওদের কণ্ঠনালির মাঝখান থেকে উপ্চে পড়ছে
টালমাটাল রতিক্রিয়ার ধ্বনি!
শূন্যতার পর মিশে গেছে আরো খানিক শূন্যতা—
সভ্যতার চূড়া বেয়ে উঠে যাচ্ছে
গহিন গোঙানি;
পৃষ্ঠা পৃষ্ঠা লগবুকে লেখা হয়ে যাচ্ছে
কোনো এক বাতিল পুরোহিতের স্বর্গভ্রষ্ট উপাখ্যান!


মতামত জানানোর জন্য ধন্যবাদ, কার্তুজ'এর সঙ্গেই থাকুন।