কার্তুজঃ আপনার পরিচয়টা যদি শুরুতেই জেনে নেওয়া যেত তবে ভালোই হয়, মানে জানতে চাচ্ছিলাম আপনার নাম, পেশা, নিজেকে নিয়ে নিজের মন্তব্য এবং নিজেকে আপনি কীভাবে ভাবতে ভালোবাসেন?
অভিক দত্তঃ হুমায়ূন আহমেদ বলতেন “I am nobody…” কিন্তু সেটা বলাটা ঠিক হবে না, পাব্লিক আঁতেল ভাবতে পারে, কেউ কেউ গম্ভীর মুখে বলে ফেলতে পারেন “ব্যাটা কয় কি”, যাক গে, ওসব বাদ দিয়ে বলা যাক, আমি অভিক দত্ত পেশাগত ভাবে একজন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। নেশাগত ভাবে, গভীর মাতাল, সন্ধ্যে সাতটার পরে বোতল নিয়ে বসি, তখন সাহিত্য টাহিত্য মাথায় আসে বলে কিছু লেখালেখিও করি, আদরের নৌকা বলে একটা ওয়েব ম্যাগাজিন কষ্টে সৃষ্টে চালাই যখন ইচ্ছা টিচ্ছা হয়। বাকি সময় ফেসবুকে ক্রিমিনাল কেস খেলি। ঘরের মধ্যে মেয়েদের ব্রা খোঁজার খেলা। ভারী মজাদার লাগে।
কার্তুজঃ সাহিত্যের সাথে আপনার পরিচয় কীভাবে?
অভিক দত্তঃ এই রে, অনেক গভীর কথা খুঁজতে চাইছেন মনে হচ্ছে, ক্লাস এইটে পড়তাম। মাস্টার মশাইকে লুকিয়ে বাথরুমে বিড়ি খাবার সময় এক বন্ধু রসালো নারীর উপাখ্যান নামের একটা বই পড়িয়েছিল। রগরগে বই। তবে ভারী ভাল। সেই যে পাশের বাড়ির ভাবীর সাথে নিবিড় যোগাযোগ, সেই দিয়েই সাহিত্যের শুরু। পরে দেখলাম সবাই ওইটাই লেখে, ভদ্রভাষায়!
কার্তুজঃ সাহিত্যের মূল স্পন্দন, মানে ‘কবিতা’র সাথে আপনার যোগাযোগ কীভাবে শুরু? এবং সেটা কবে থেকে?
অভিক দত্তঃ প্রথাগত শিক্ষার বাইরে তো? এক বন্ধু শোনাল
..................“একদা রামচন্দ্র গিয়েছিলেন বনে,
...................সেখানে একটি কাঠপিঁপড়া কামড়াল তার ধনে,
...................রাম বলেন সীতা সীতা সীতা,
...................সীতা তখন উলঙ্গ হয়ে পড়ছিলেন গীতা ”
ইত্যাদি; ক্লাস সেভেন তখন। উপরের কবিতাটা যদি সেন্সর বোর্ডের ছাকনিতে আটকে যায় তাহলে যেন এটা থাকে যে, ক্লাস সেভেনে পাড়ার লাইব্রেরী থেকে জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন পড়ি। তখন থেকে...
কার্তুজঃ আপনাকে কেন কবিতা পড়তে হয়? সেইসাথে জানতে চাইব আপনি ‘কবিতা’ পড়েন নাকি আপনি নিজেকে পড়তে/চিনতে/জানতে ‘কবিতা’ একটা মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। যদি মাধ্যম হিসেবেই কাজ করে তাহলে সেটা কীভাবে?
অভিক দত্তঃ ওই যে বললাম। সন্ধ্যে সাতটার পরে বোতল নিয়ে বসার পর কবিতা পড়তে হয় যেহেতু একটা ওয়েব ম্যাগ চালাই। কবিতা টবিতা আমি বুঝি না। সবাই পাঠায়। আমি কবিতা গুলি নাম্বার দিয়ে লুডোর ছক্কা ফেলি। ধর তিন পড়ল। তখন তিন নম্বর কবিতা ছাপিয়ে দিই।
কার্তুজঃ কী ধরণের কবিতা আপনার পছন্দ ? সাথে যদি কারণটাও বলে দিতেন...
অভিক দত্তঃ ছোট দুলাইন হলে সব চেয়ে ভাল। বড় কবিতা পড়লে ঘুম পায়। আমার আবার ওই এক রোগ আছে, যেখানে সেখানে ঘুমিয়ে পড়ি।
কার্তুজঃ “দিন দিন মানুষ কবিতার উপর আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে” –কথাটির সাথে কি আপনি একমত? যদি তাই হয় তাহলে এর পিছনে মূল কারন কী?
অভিক দত্তঃ না একমত নই। আগ্রহ বেড়ে চলেছে। গিনিপিগ যেভাবে বংশবৃদ্ধি করে তার চেয়েও বেশি গতিতে। ফেসবুকে দেখেন না। একটা কবিতা। সেটাতে দুইশোজন ট্যাগ হয়েছে। নানা রকম এক্সপার্ট কমেন্ট। “শেষ লাইনে ‘মধুবাঁশ’ শব্দটা দারুণ লাগল”, এইধরনের নানা রকম কমেন্ট। কি যে বলেন... হুহ। কমে যাচ্ছে। আমার মনে হয় এ যুগে রবি ঠাকুর জন্মালে লাইকের হিসাবে তিনিও এদের কাছে হেরে যেতেন। লিখে ফেলতেন “হায় গো, কবিতায় কথা যায় ডুবে যায় যায় গো”।
কার্তুজঃ “কবিতা যারা পড়েন বা বুঝেন তারাও কবিতা লিখতে শুরু করেন, তারাও কবি হতে চান!” –কথাটি কতটুক সত্য মনে হয়? আপনার ক্ষেত্রেও কি এমনটা হয়েছে, এমনটা হওয়ার কারন কী?
অভিক দত্তঃ না কবিতায় আমার অ্যালার্জি আছে। কবিতা পড়লে আমার হাঁচি শুরু হয়। ওষুধ খেতে হয়। তবে এখন চন্দ্রিল বলে দিয়েছেন ফেসবুকে কেউ কেউ নয় সকলেই কবি।
কার্তুজঃ বিভিন্ন কবিদের কবিতা পড়ে কি আপনার কখনো মনে হয় যে- এটা এই ভৌগলিক সীমারেখার, ওটা ঐ ভৌগলিক সীমানার? আর আপনি কিরকম ভাবেন মানে ‘কবিতা হবে সীমানা বিহীন (ইউনিভার্সাল)’ নাকি ‘কবিতা শুধু নির্দিষ্ট সীমানার কথা বলবে ?’
অভিক দত্তঃ ওই যে ভাই বললাম আমার অ্যালার্জি আছে। পড়ি না। তবে হ্যাঁ। এখনও কারও কারও কবিতা পড়লে মনে হয় ভৌগলিক না, ঐতিহাসিক সমস্যা আছে। কেউ কেউ মধুসূদন কেউ কেউ রবি ঠাকুরের সাথে এই সময়ে দাঁড়িয়ে প্রাণপণে পাল্লা দিয়ে যাচ্ছেন।
কার্তুজঃ পূর্ববর্তী কবিদের লেখনীর সাথে বর্তমান কবিদের লেখায় বিশেষ কোন পার্থক্য কি আপনার চোখে পড়ে? সেটা কেমন? কোনটাকে গ্রহন করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ হয়, কেন?
অভিক দত্তঃ একদল আছে, যাদের লেখা কিছুই বোঝা যায় না, মানে দুর্বোধ্য করাটাই তাদের স্টাইল। আরেকদল আছে, যাদের লেখা পুরোটাই বোঝা যায় কিন্তু সেটা কবিতা মনে হয় না।
আরেকদল আছে যারা সংখ্যায় কম, তারা ভাল লিখছে। কিন্তু কেন আমার ভাল লাগছে সেটা জিজ্ঞেস করবেন না বলতে পারব না।
কার্তুজঃ যাদের লেখা কবিতা আপনার ভালো লাগে, এই শেষে এসে যদি তাদের একটু স্মরণ
করতেন...
অভিক দত্তঃ
লিজেন্ডদের মধ্যে (মানে যারা কবিতার জগতের ডন ব্র্যাডম্যান টাইপ আর কি)
জীবনানন্দ দাশ, জয় গোস্বামী, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ।
আর এই সময়ে ভাল লাগে
রঙ্গিত, কৌস্তভ, কিঙ্কিণী, সৌভিক দা’, জুবিন, অনুপম মুখোপাধ্যায় প্রমুখের কবিতা।
❑ সাক্ষাৎকার গ্রহন : সিপাহী রেজা
মতামত জানানোর জন্য ধন্যবাদ, কার্তুজ'এর সঙ্গেই থাকুন।