সাহিত্যে তুলনা প্রবণতা সৃষ্টিশীলতার অন্তরায়
সাহিত্য যেমন ছেলেখেলা নয়, তেমনই ছকে বাঁধা কোনো বিষয় নয়। সাহিত্যের কোনো সংবিধান আছে বলেও মনে করি না। গৎবাঁধা নিয়ম-নীতি মাথায় রেখে তো আর সাহিত্য সম্ভব নয়। কিন্তু সমস্যার সূত্রপাতটা তখনই হয় যখন কতিপয় তথাকথিত ‘সাহিত্যবোদ্ধা’ (পড়–ন ‘বুদ্ধু’) তরুণদের হাতে সাহিত্যের নিয়ম-তালিকা ধরিয়ে দেবার চেষ্টা করেন।
ধরা যাক, মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ সুজন একজন তরুণ কবি। সার্বিক সুবিধার কথা বিবেচনা করে তিনি তার লেখক নাম হিসেবে ‘সুজন মাহমুদ’ লিখতেই পারেন। দুই একজন হয়তো পাণ্ডিত্যের জোশে লাফিয়ে ওঠে বলবেন, ‘ঢঙ করে নাম পরিবর্তনের কী দরকার? রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ তো নাম বদল করে কবি হননি’। গেলো এক কথা, এখন এই সুজন মাহমুদ যদি গতানুগতিক ধারাকে ভাঙতে চান, নতুনত্ব আনতে চেষ্টা করেন লেখায়; তাহলেও কথা ওঠবে, ‘পাকামো হচ্ছে খুব, বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিকেরা তো অতো ইঁচড়ে পাকা ছিলেন না’। কথায় কথায় এভাবে পীরের মাজার দেখানোর উদ্দেশ্য বা প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করা আসলেই দুঃসাধ্য। অনবরত এরকম অযৌক্তিক মন্তব্য করে তরুণ প্রজন্মকে কি শৃংখলিত আর গন্ডিবদ্ধ করে রাখা হচ্ছে না? সবচেয়ে বড় সমস্যাটাই হচ্ছে আমাদের হীনতা আর ঘরকুনো স্বভাব। বাসি খেতে খেতে টাটকা খাবারে এখন আমাদের বদহজম হয়। একজন চিত্রশিল্পী হয়তো গাছপালার পটভূমিতে বিবসনা নারীচিত্র এঁকে তাকে নান্দনিক ও প্রকৃতিঘেঁষা বলে বিশেষায়িত করতে পারেন। তিনিই হয়তো আবার আধুনিক কিংবা উত্তরাধুনিক কবিতা পড়তে গিয়ে কোনো কোনো শব্দকে আপত্তিকর বা অশ্লীল বিবেচনা করে নাক উঁচু করবেন। আসল ব্যাপারটা হচ্ছে স্ববিরোধীতা। আমি কে, আমি কী, কোথায় আছি, অর্থাৎ নিজের অবস্থান নিজের কাছে স্পষ্ট না হলে এমনটা হয়।
অনেকে বলেন, ‘অমুক শব্দটা কবিতায় ব্যবহার করা ঠিক না, তমুক বাক্যটা আপত্তিকর’। এর মানে হলো, রাতবিরাতে নিষিদ্ধপল্লীতে যেতে সমস্যা নেই, দিনের বেলা প্রসঙ্গ টানাই যেনো মহাপাপ। এখানেও সেই পীর-মুর্শিদের দোহাই, ‘রবীন্দ্রনাথ বিশ্বকবি ছিলেন, তিনি তো কখনও এমন শব্দ বা এমন বাক্য ব্যবহার করেননি। নজরুল কবিতার বাণে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন চারপাশ, তাঁর ভাষাও তো যথেষ্ট মার্জিত’। বুঝলাম, কিন্তু এক দোহাই বারেবারে দেওয়ার মানে কী? আমাদের নানা-দাদারা খড়ম পায়ে হাঁটতেন, ধুতি আর পাঞ্জাবি পরতেন; তাই বলে আমরা চামড়ার সু কিংবা স্যুট-সাফারি পরলে গায়ে ফোস্কা পড়বে এমন তো কথা নেই। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন জমিদার, কোনো পিছুটান ছিলো না তাঁর; অভাবের সংজ্ঞা জিজ্ঞেস করলে নিশ্চয়ই বিষম খেতেন। নজরুলের মতো পাঁচ টাকা বেতনে রুটির দোকানে চাকরি করতে হলে আদৌ তাঁর কবি হওয়া হতো কিনা তা বোধ করি গবেষণার দাবি রাখে।
থাক সে কথা, মূল কথায় আসি। পূর্বকাল থেকে যাঁরা সাহিত্যকে ধারণ ও লালন করেছেন, সমৃদ্ধ করেছেন সাহিত্যের আঙিনা; তাঁদেরকে এড়িয়ে যাবার কথা এখানে বলা হচ্ছে না। তাঁদের সাহিত্য তো অবশ্যপাঠ্য। তবে পাঠ যেনো পাঠের মতোই হয়। কবিগুরুর উপন্যাসের চেয়ে ছোটগল্প কিংবা কবিতার চেয়ে গান যে অধিক হৃদয়গ্রাহী ও মননস্পর্শী সেটা তো অনুধাবন করতে হবে। জীবনানন্দ এতো বড় মাপের কবি, অথচ রবীন্দ্রসঙ্গীত বা নজরুলগীতির মতো একটিও গান বা গীতল কবিতা তাঁর নেই। জসীম উদ্দীনের পল্লীকাব্যের সাথে আর কারো তুলনা করা কি চলে? তাঁদের সাহিত্যকে হৃদয়ঙ্গম করে সেসবের নির্যাস তো নিতে হবে। জানতে হবে, বুঝতে হবে, খুঁজতে হবে। তার মানে তো এই নয় যে, তাঁদের সাহিত্যকাঠামোর বাইরে কিছু করা যাবে না।
আজকাল যারা অনলাইনে লেখালেখি করছেন (অনেকেই বেশ ভালো লিখছেন, এ সময়ের অনেক তরুণ লেখকেরই যাত্রা শুরু অনলাইন সাহিত্য দিয়ে) তাদেরকে কত জন যে আড়চোখে দেখেন গুণে বের করা মুশকিল। আবারও সেই মাজার প্রদর্শন, ‘রবীন্দ্রনাথ তো ফেসবুকের কবি ছিলেন না, ব্লগের কবি ছিলেন না’। আচ্ছা বেশ, বুঝলাম। কিন্তু যে পরিমাণ অর্থবিত্তের মালিক রবীন্দ্রনাথ ছিলেন, এ যুগে হলে হয়তো ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট কিংবা ব্লগসাইট খুলে বসতেন, আর আমরা সেখানে একাউন্ট খুলতাম। আগেকার দিনে প্রাকৃতিক কর্ম সারার জন্য বাড়ির পেছনের ঝোপঝাড় কিংবা গাঙপাড় ব্যবহৃত হতো বলেই এখন হাই-কমোড ব্যবহার নিষেধ নাকি? যতোসব হাস্যকর যুক্তিতর্ক! আজকালকার বয়োজ্যেষ্ঠদের (সবাই নয়, তবে অনেকেই) একমাত্র কাজই হচ্ছে তরুণদের হাতে-পায়ে শিকল পরানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। এই লেখার শুরুতে উল্লিখিত সুজন মাহমুদ কি রবীন্দ্রনাথ হবেন? নাকি নজরুল, জীবনানন্দ, জসীম উদ্দীন হবেন? নিশ্চয়ই নয়। কেন হবেন? কেন হতে যাবেন? এঁরা প্রত্যেকেই তো একেকটা অধ্যায়, একেকটা স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানের মতো। বড় মাপের সাহিত্যিক যদি হতেই হয়, সুজন মাহমুদ তো সুজন মাহমুদই হবেন।
প্রকৃতপক্ষে, সাহিত্য এমন একটা অঙ্গন- যেখানে আলোচনা আছে, সমালোচনা আছে। মতৈক্য আছে, মতানৈক্য আছে, মতান্তর আছে; থাকাটাই স্বাভাবিক। এগুলো আছে বলেই সাহিত্য টিকে আছে। তবে অন্ধভাবে কারো সাহিত্যকাঠামোকে অনুসরণ করা নেহাত আত্মঘাতী কাজ। অন্তত এটা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, কথায় কথায় পূর্বসুরীদের কাজের সাথে তুলনা দেওয়াটা সাহিত্যের উন্মেষের জন্য এক মহামারী সমস্যা, একটি ভালো বীজকে অঙ্কুরে বিনষ্ট করার উল্লেখযোগ্য কারণ। একে ঠিক ‘তুলনা’ না বলে ‘মূর্খামি’ বলাই শ্রেয়। সৃষ্টিশীলতার ক্ষেত্রে এটি একটি বড় অন্তরায়। বলয় ভেঙে নতুন ধারা সৃষ্টি করতে গেলে অবশ্যই চিন্তায়, চেতনায়, মননে সমকালীন বাস্তবতা থাকা আবশ্যক। ছিঁড়তে হবে আঁধারের জাল, মৌলিক কাজ করতে হবে দেয়াল ভাঙার আঙ্গিকে। জয়তু সাহিত্য, জয়তু মানবতা।
মতামত জানানোর জন্য ধন্যবাদ, কার্তুজ'এর সঙ্গেই থাকুন।